দেশের অন্যতম ‘খাদ্যভাণ্ডার’ হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখন উৎসবের বদলে বিষাদের সুর। যে বোরো ধানের ওপর দেশের ১৮ শতাংশ খাদ্য চাহিদা নির্ভর করে, সেই সোনালি ফসল আজ পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে পানির নিচে। গতকাল শুক্রবার (১ মে) ভোররাত থেকে শুরু হওয়া বজ্রসহ বৃষ্টি আজ শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে থামে। উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে নতুন করে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ।
কৃষকের যে হাত এখন গোলা ভরার ব্যস্ততায় থাকার কথা, সেই হাত আজ বুক চাপড়াচ্ছে। একদিকে দিগন্তজোড়া থৈ থৈ পানি, অন্যদিকে আকাশচুম্বী শ্রমিক সংকট—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কয়েক হাজার কৃষক।
টানা কয়েক দিনের দুর্যোগের পর গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রোদের দেখা মিলেছিল। কৃষকেরা আশায় বুক বেঁধে ধান কাটা ও মাড়াই শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গতকাল শুক্রবার (১ মে) ভোররাত থেকে ফের শুরু হওয়া বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে পড়েছে। ধান কাটা ও শুকানো নিয়ে নতুন করে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাওরের মানুষ।
কৃষকদের দাবি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। তবে কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, জেলায় মোট নিমজ্জিত জমির পরিমাণ ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর। এর মধ্যে ইটনায় সবচেয়ে বেশি সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে প্রায় ২৫ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে কৃষি বিভাগ এখনো টাকার অঙ্কে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নিরূপণ করেনি। এর আগে হাওর অঞ্চলে শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় মোট ২৪৬১ হেক্টর জমির বোরো ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কেবল খেতের পাকা ধানই নয়, ধানের খলাতেও (মাড়াইয়ের স্থান) এখন হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। মাড়াই করা শুকানো ধান পচে যাচ্ছে, ভেসে গেছে গবাদি পশুর প্রধান খাদ্য খড়।
অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “ধান তো গেছেই, হাওরে রাখা খড়গুলোও বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে। সারা বছর আমাদের উপোস থাকতে হবে, গরুগুলোও না খেয়ে মরবে।”
নিকলীর সিংপুর ইউনিয়নের কৃষক ইদ্রিস আলীর দেড় একর জমিরও বেশির ভাগ তলিয়ে গেছে। যেটুকু জমি ভেসে আছে, সেটুকুও শ্রমিকসংকটে কাটাতে পারছেন না।
অস্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, পানির জন্য হার্ভেস্টারে ধান কাটে না। ধাওয়ালও (কৃষি শ্রমিক) পাওয়া যায় না। সকালে ক’জন ধাওয়াল নিয়ে হাওরে গিয়ে ফিরে এসেছি, কারণ ডুবন্ত জমি সনাক্ত করা যাচ্ছে না। হাওরে পানি আর পানি এবারের ক্ষতি কোন ভাবেই পোষানো যাবে না। এক কানি (৭৫ শতাংশ) জমির ধান কাটতো পাঁচ হাজারে, এখন ৮-১০ হাজার টাকা দিয়েও ধাওয়াল পাওয়া যাচ্ছে না।
হাওরের কৃষকেরা জানান, এবারের বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই তারা নানা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করছেন। চড়া দামে সার কেনা এবং ডিজেল সংকটের পাশাপাশি ব্রি-৮৮ ধানে মিশ্রণের অভিযোগও ছিল কৃষকদের। বোরো ধান পাকার মুখে প্রথমে শিলাবৃষ্টি, এরপর কয়েক দফায় অতিবৃষ্টি এবং সর্বশেষ এই পাহাড়ি ঢল—সব মিলিয়ে চার দফায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেন তাঁরা।
এদিকে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অস্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান শুক্রবার ও শনিবার হাওর এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে কথা বলেছেন। তিনি কৃষকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে খুব দ্রুত আমি এলাকাতে এসেছি। আমাদের নেতা তারেক রহমান সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন যে, তিন মাসের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের কৃষকদের প্রণোদনা দেবেন। উপজেলা প্রশাসনসহ সবার সঙ্গে কথা বলেছি। ইনশাআল্লাহ আমরা এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পারব।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, অষ্টগ্রাম পয়েন্টে কালনী নদীতে ১৫ সেন্টিমিটার, চামড়াঘাট পয়েন্টে মগড়া নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার এবং ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনা নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়েছে। সবকটি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নিকলী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, গত ২৪ ঘন্টায় মোট ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার (২ মে) দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। বৃষ্টি না হলে ধান কাটতে বলেছি।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুরক্ষা ও সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মন্তব্য করুন