সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের (৩০) বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্তব্ধ হয়ে গেছে পরিবারের সদস্যরা। জাহাঙ্গীর আলম কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের মোঃ হজরত আলীর ছেলে। প্রায় ১১ বছরের বেশি সময় ধরে জাহাঙ্গীর আলম সেনাবাহিনীতে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
উপজেলা প্রশাসন জানায়, মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠটি প্রস্তুত করা হয়। রোববার (২১ ডিসেম্বর) সকাল থেকেই সেনাবাহিনীর একটি দল সেখানে অস্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে। সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানায় প্রশাসন।
এদিকে রোববার (২১ ডিসেম্বর) সাড়ে ৪ টায় হেলিকপ্টারে করে পাকুন্দিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আনা হয়। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নেওয়া হয় গ্রামের বাড়ি একই উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামে। বিকেল ৪ টা ৪৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ির সামনে ফসলের মাঠে তাঁর জানাজা হয়। পরে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানাজায় অংশ নেন। এর আগে রোববার (২১ ডিসেম্বর) সকাল সোয়া ৯টার পর ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
গত ১৩ ডিসেম্বর মৃত্যুর সংবাদ বাড়িতে পৌঁছার পর থেকেই আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরে রোববার (২১ ডিসেম্বর) মরদেহ গ্রামের বাড়ির সামনে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ ভারী হয়ে উঠে।
জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশীসহ আশপাশের মানুষজন সকাল থেকেই ভিড় করছেন। জাহাঙ্গীরের বাবা হজরত আলী ডুকরে কেঁদে উঠছেন। মা পালিমা বেগমের কান্না থামছে না। তিনি বারবার ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন। স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। চোখে জমে ছিল হাজারো না বলা কথা আর দীর্ঘশ্বাস। তিন বছর বয়সী শিশু ইরফান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল মায়ের দিকে। বাড়ির উঠোনজুড়ে এখন শুধু কান্না আর হাহাকার। বাবার আদর কী, তা বোঝার আগেই চিরতরে পিতৃহারা হলো ছোট্ট ইরফান।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর দ্বিতীয়। তাঁর বড় ভাই মস্তোফা কামাল সৌদি প্রবাসী, তিনি মৃত্যুর খবর পেয়ে চলে এসেছেন দেশে। আর ছোট ভাই শাহীন আলম গাড়ি চালক। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। রংপুর ক্যান্টনমেন্টে চাকরিরত অবস্থায় গত ৭ নভেম্বর তিনি শান্তি রক্ষা মিশনে অংশ নিতে সুদানে যান। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আশাতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশের মাটিতে শান্তিরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন জাহাঙ্গীর আলম এই কথাও জানান পরিবারের সদস্যরা।
মিশনে যাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় জাহাঙ্গীরের এমন করুণ মৃত্যু মানতে পারছেন না স্থানীয় মানুষেরা। তাঁরা জানান, পরিবারের দায়িত্ব তিনিই পালন করতেন। এলাকায় আর্দশবান ও নিষ্ঠাবান হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। এমন মৃত্যুতে সকল আত্মীয় স্বজনরা শোকে কাতর। জাহাঙ্গীর আলমের আত্মত্যাগ, দেশপ্রেমে সুদানে শান্তি রক্ষা মিশনে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ যেনো উনাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুক। জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন তাঁর পরিবারের মূল চালিকাশক্তি। আমরা সরকারের প্রতি আহবান করছি তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর।
জাহাঙ্গীরের সম্বন্ধী মো. ওয়ালী উল্লাহ বলেন, জাহাঙ্গীর শাহাদাত বরন করেছে। তার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেনো জাহাঙ্গীরকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন। হাশরের ময়দানে যেনো আল্লাহ জাহাঙ্গীরকে শহীদ হিসেবে এবং আমার বোনকে শহীদের স্ত্রী হিসেবে জাহাঙ্গীরের পাশে দাঁড় করান। এলাকাবাসীর প্রতি আমার আহবান আমার বোন আর ভাগনের দিকে খেয়াল রাখবেন। সুখে দুঃখে তাদের পাশে থাকবেন।
জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার স্বামীর ছবি ও ৩ বছরের ছেলে ইফরানকে বুকে আঁকড়ে ধরে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকছেন। মাঝেমধ্যে চিৎকার করে কেঁদে উঠছেন। রুবাইয়া আক্তার বলেন, তুমি আর আসবে না। যদি জানতাম এই পোশাক আমার স্বামীকে কেড়ে নেবে, তাহলে কোনো দিনই মিশনে যেতে দিতাম না। আমাকে কথা দিয়েছিল ফিরে আসবে। সে তো এলো না। কেনো এলো না। সে তো ওয়াদা ভাঙতে পারে না। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার স্বামীকে এনে দাও আল্লাহ। বলতে বলতে আবারও মূর্ছা যান তিনি। আর বলেন আপনারা আমার স্বামীকে এনে দেন।’
নিহতের বাবা হযরত আলী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার ছেলে আমাদের সব চালাতো। ঋণ করে ঘর বানাচ্ছিল, আশা ছিল এই ঘরেই থাকবে। সেই আশা আর পূরণ হলো না।
বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন শহীদ জাহাঙ্গীর আলমের মা পালিমা বেগম। তিনি বলেন, আমার ছেলে কই? কেউ আমার ছেলেরে আইনা দেও। আল্লাহ তুমি আমার ছেলেরে আইন্না দেও। সে কারও ক্ষতি করে নাই। তবু কেন আমার ছেলেটারে মারল?’ এই বলে বারবার লুটিয়ে পড়ছেন। যাওয়ার আগে বলছিল মা, তোমরা চিন্তা কোরো না, ভালো থেকো। এই কথা বলে কেঁদেই চলেছেন তিনি।
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুপম দাস ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত জাহান বলেন, বাংলাদেশ সেনা সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে একই সাথে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীকে গর্বিত করেছেন। পাকুন্দিয়া উপজেলা প্রসাশন তার পরিবারের পাশে আছেন, আজকে উপজেলা প্রশাসন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে। যখনই প্রয়োজন পরবে তখনই উপজেলা প্রশাসন তার পরিবারের পাশে থাকবে।
মন্তব্য করুন