আমাদের সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ এখনো স্বাভাবিক কোনো ঘটনা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই বিচ্ছেদ যেন বহুগুণ মানসিক চাপ বয়ে আনে। আত্মীয়দের প্রশ্নবাণ, প্রতিবেশীদের কৌতূহলী দৃষ্টি, আর কখনো কখনো নিজের পরিবারের অনীহা—সব মিলিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিচ্ছেদের পর আনন্দ বা উদ্যাপনের ভাবনাটি অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে সময় বদলাচ্ছে। বিশ্বের নানা দেশে, এমনকি আমাদের সমাজের একাংশেও, কিছু নারী বিবাহবিচ্ছেদকে আর শুধুই ব্যর্থতার গল্প হিসেবে দেখছেন না। বরং এটিকে দেখা হচ্ছে আত্মপরিচয় নতুন করে আবিষ্কারের একটি অধ্যায় হিসেবে। এই বদলে যাওয়া মানসিকতারই এক প্রতীক হয়ে উঠেছে ‘ডিভোর্স রিং’।
পশ্চিমা বিশ্বে আলোচিত এই ধারণাটি উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। দেখতে এই আংটিগুলো অনেকটাই বিয়ের বা এনগেজমেন্ট রিংয়ের মতো—ঝকঝকে ধাতু, কখনো দামি পাথরের ছোঁয়া। কিন্তু এর তাৎপর্য সম্পূর্ণ আলাদা। এই আংটি পরার মধ্য দিয়ে অনেকে জানিয়ে দেন, তাঁরা একটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে এখন নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই নিতে চান।
লন্ডনে বসবাসকারী গয়না নির্মাতা আনুশকা ডুকাস মনে করেন, ডিভোর্স রিং কোনো দুঃখের স্মারক নয়। তাঁর কাছে এটি আনন্দ, স্বস্তি আর আত্মসম্মানের প্রতীক। তাঁর বুটিকে নিয়মিত আয়োজন করা হয় ‘ডিভোর্স রিং পার্টি’, যেখানে বিচ্ছেদ–সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত মানুষরা একত্র হন। সেখানে কান্না বা বিষাদের বদলে থাকে হাসি, গল্প আর একে অপরকে বোঝার চেষ্টা। ডুকাসের মতে, এই আয়োজনগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো একাকিত্ব ভেঙে একটি সহমর্মিতার জায়গা তৈরি করা।
এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে পরিচিত মুখগুলোর প্রভাবও কম নয়। মার্কিন মডেল ও অভিনেত্রী এমিলি রাতাজকাউস্কি তাঁর বিচ্ছেদের পর পুরোনো এনগেজমেন্ট রিংয়ের হীরাকে নতুনভাবে ব্যবহার করে দুটি আংটি তৈরি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলো ভাগ করে নিয়ে তিনি যেন বোঝাতে চেয়েছেন—অতীতকে অস্বীকার নয়, বরং তাকে নতুন অর্থ দেওয়াই তাঁর পথ।
তবে বিচ্ছেদ উদ্যাপন মানেই যে দামি গয়না, তা নয়। অনেকের কাছে এটি মানসিক মুক্তির অনুভূতি মাত্র। কেউ সেই মুক্তিকে প্রকাশ করছেন শরীরে ট্যাটুর মাধ্যমে, কেউ বন্ধুদের নিয়ে ছোটখাটো পার্টিতে, আবার কেউ নিজের ঘর নতুনভাবে সাজিয়ে। সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা #DivorcedMomCore ট্রেন্ডেও এই মনোভাবই ফুটে উঠছে—এবার জীবন চলবে নিজের নিয়মে, নিজের পছন্দে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রবণতা আসলে নারীর আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের একটি নতুন ভাষা। দীর্ঘ সময় ধরে বিয়ে ও সংসারকে নারীর সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়েছে। ডিভোর্স রিং সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানেই সব শেষ নয়—অনেক সময় সেটিই হয় নিজের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার শুরু।
মন্তব্য করুন