দেশজুড়ে যখন ত্যাগের মহিমায় ঈদুল আজহার উৎসব শেষ হলো, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে তখন রয়ে গেল কেবলই এক মহাশ্মশানের নীরবতা আর নিঃস্ব মানুষের বুকফাটা হাহাকার। এবারের কোরবানি ঈদ এই অঞ্চলের বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জীবনে কোনো আনন্দের ছোঁয়া তো দিতেই পারেনি, উল্টো দিয়ে গেছে এক নির্মম মানসিক ক্ষত। অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের কবলে পড়ে ২৭৮ কোটি টাকার সোনালি স্বপ্ন যখন পচা ধানের তীব্র ভ্যাপসা গন্ধে রূপ নিয়েছে, তখন ধারদেনা আর লোকসানের বোঝায় পিষ্ট হাওরের বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পক্ষে এবার কোরবানি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
১,৩৫৪ টাকা মণের ধান যখন মাত্র ৪০০ টাকার পানির দরে আড়তদারদের হাতে তুলে দিতে হয়েছে, তখন ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, দুমুঠো অন্ন জোগানোই ছিল তাঁদের প্রধান লড়াই। ঈদের দিন সকালে যখন দেশের আকাশ পশুর রক্তে রাঙা হচ্ছিল, তখন হাওরের বেশিরভাগ কিষান-কিষানিরা নীরবে কেঁদেছেন ঘরের কোণে জমে থাকা কালচে, চারা গজানো ধানের স্তূপের দিকে চেয়ে। সব মিলিয়ে কোরবানি দিতে না পারা কৃষকের শূন্য পকেট প্রমাণ করছে, উৎসবের আলো সবার ভাগ্য বদলাতে পারে না। অবর্ণনীয় এই ফসলহানির ধাক্কায় কোরবানিহীন এক বিষাদময় ঈদ কাটিয়ে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছেন হাওরের হাজারো কৃষক।
তেমনই একজন ইটনা উপজেলার এন সহিলা গ্রামের মিজান মিয়া (৩৫)। ধারদেনা করে ২.৫ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন এই তরুণ কৃষক। আক্ষেপ উগড়ে দিয়ে তিনি বলেন, কোরবানির ঈদ আইল আর চইলা গেল, অথচ একটা খাসি কেনার ক্ষমতাও এবার আমার অইল না। আড়াই একর জমির ধান কাটলাম বুক সমান পানি থেইকা, সেই ধান ঘরের কোণায় পইড়া পইড়া গন্ধ ছড়াইছে, কেউ ৪০০ টাকা মণেও নেয়নি।
একই গ্রামের ৩ একর জমিতে বোরো আবাদ করা ৫০ বছর বয়সী মিলন মিয়া। কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ নিয়ে মিলন মিয়া বলেন, তিন একর জমির পেছনে নিজের ও লাখ টাকার ওপরে ধারদেনা কইরা ঢালছিলাম। আশা আছিল ভালো ধান উঠব, মনের সাধ মিটায়া একটা গরু কোরবানি দিমু। অথচ কুদরত আমাগোরে এমন মার মারল যে, কোরবানি তো দূরের কথা—পচা ধানের বাজারে নিজেরা কী খামু সেই ঠিক নাই।
সারা জীবন নিজে কোরবানি দিলেও এবার শূন্য হাতে ঈদের দিন পার করতে হয়েছে ৬৫ বছর বয়সী প্রবীণ কৃষক কাছম আলিকে। ২ একর জমিতে চাষ করা এই প্রবীণ বুকফাটা কণ্ঠে বলেন, ২ একর জমির ফসল ঢলের পানিতে পইচা কালচে হয়া গেছে। আড়তদারেরা এই ধানের দিকে ফিরাও তাকায় না। আমাদের মতো কৃষকের বাঁচা-মরা দিয়া কার কী আসে যায়? সরকারও আমাগো ভেজা ধান নেয় না। ধারদেনা করারও সুযোগ নাই। যাদের কাছ থেকে ধার তারাও আমার মতো ক্ষতিগ্রস্ত। কোরবানিতো দূরের কথা কারও জন্য জামাকাপড়ও কিনতে পারি নাই।
হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এখন কেবলই উৎসব হারানোর হাহাকার। করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আবু বকর প্রতিবছরই বড় পরিসরে কৃষিকাজ করেন। এবারও নিজের আর বর্গা নেওয়া মিলিয়ে মোট ৭০ কানি জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, ঈদের আগে কিছু ধান বেচে মাদরাসাপড়ুয়া ছোট ছেলে তাকিনকে একটি পাঞ্জাবি আর নিজের জন্য লুঙ্গি কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভেজা ধান কেউ কিনেনি। ফলে ঈদের কেনাকাটা হয়নি। কুরবানি তো বহুদূরে।
একই গ্রামের আরেক কৃষক হুমায়ুন মিয়া গত পনেরোটা দিন ধরে স্ত্রীকে নিয়ে খলায় পড়ে আছেন। ৩০০ মণ ধানের চাষ ছিল তার। প্রায় অর্ধেক ধান তলিয়ে যায় বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে। টেনেটুনে তিনি হয়তো দেড় শ মণ ধান পাবেন। কিন্তু তা-ও নিশ্চিত হতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘এইবার ধানে লোকসান হইবো। ঋণ হইয়া গেছে, তাই কোরবানি দেই নাই। ঈদের দিনেও আমরা ধান লইয়া রাস্তায় ছিলাম। অহনো আছি ধান শুকানির লাইগা।
হুমায়ুন মিয়া আরও বলেন, ‘শুধু মানুষ নয়, এবার গবাদি পশুও খাবারের জন্য কষ্ট করবে। খড় সংগ্রহ করতে পারেনি বেশির ভাগ কৃষক। ফলে অনেকে গরু, ছাগল, মহিষ বেচে দিচ্ছেন।’
তেলের দাম বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতার কারণে এবার ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ একর প্রতি প্রায় ১৫ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। প্রতি মণে উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ১,৩৫৪ টাকা। বিপরীতে বাজারে আড়তদারেরা ও ব্যাপারীরা এই সুযোগে নিরুপায় কৃষকদের কাছ থেকে মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা মণ দরে আধা পচা ধান কিনছেন। সেই হিসেবে প্রতি মণে কৃষকের সরাসরি লোকসান হচ্ছে প্রায় ৭৫৪ টাকা।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে হাওরের কৃষকেরা চলতি মৌসুমে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন বোরো ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন, যা থেকে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার ২৩৪ মেট্রিক টন। গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত মাত্র ৯ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে কিশোরগঞ্জ। সোমবার পর্যন্ত চার ধাপে জেলায় বোরো ধানের ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৯৬৩ হেক্টর। জেলায় সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে ৮৪ হাজার ৮৭০ মেট্রিক টন ধানের (চালে যার পরিমাণ ৫৬ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন)।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই শেষে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা জানান, প্রাথমিকভাবে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। সরকার টানা তিন মাস তাদের সহায়তা দেবে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা পাঁচ হাজার এবং কম ক্ষতিগ্রস্তরা আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। পাশাপাশি সবাইকে প্রতি মাসে ২০ কেজি করে খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, প্রাথমিকভাবে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত সাহায্য কার্যক্রমটি শুরু করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন