টানা অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের মুখে পড়া চরম প্রতিকূলতা ও আশঙ্কা পেরিয়ে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা চলতি মৌসুমে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন বোরো ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সমস্ত বাধা জয় করে হাওরের কৃষকেরা কষ্টার্জিত এই ফসল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন, যা থেকে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ২৩৪ মেট্রিক টন।
চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলে বোরোধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৪৬৪ মেট্রিক টন। আর এতে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩০৯ মেট্রিক টন।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, “সোমবার (২৫ মে) পর্যন্ত হাওরে শতভাগ আর নন-হাওরে ৯৯ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে।”
তবে সোনালি ধানে গোলা ভরার কথা থাকলেও, এবার হাওরের কৃষকের ঘরে উঠেছে অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে নষ্ট হওয়া কালচে ও আধা পচা ধান। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে কিশোরগঞ্জে বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৭৮ কোটি টাকার, যা সরাসরি আঘাত হেনেছে ৫২ হাজার ৯৮০ জন কৃষকের জীবনে। মাঠের ফসল ঘরে তোলার এই বিপর্যয়ের ধাক্কা এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে। স্তব্ধ হয়ে পড়েছে ঐতিহাসিক চামড়া নৌবন্দর।
ধান তোলার পর আসল বিপত্তি: শুকানোর সংকট ও পচন
মাঠের বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হলেও আসল বিপত্তি বেঁধেছে শুকানোর প্রক্রিয়া নিয়ে। প্রায় প্রতিদিনই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামায় কৃষকেরা তাঁদের কষ্টের ফসল কোনোভাবেই শুকাতে পারছেন না। বাড়ির আঙিনা, ঘরের মেঝে কিংবা সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা ধানের দিকে চেয়ে বুক ফাটছে কৃষকদের। একটুখানি রোদের আশায় সারাদিন মেঘলা আকাশের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকছেন কিষান-কিষানিরা। কিন্তু মেঘ-বৃষ্টির এই লুকোচুরিতে পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়ায় ভেজা ধানের স্তূপেই ধরেছে পচন, ছড়াচ্ছে ভ্যাপসা গন্ধ, গজিয়েছে চারা। চোখের সামনে সোনালি ধানের রং কালচে হয়ে নষ্ট হয়ে গেলেও প্রকৃতির এই বৈরিতার কাছে সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে পড়েছেন হাওরের কৃষকেরা।
তাড়াইল উপজেলার ধলা ইউনিয়নের কলমা হাওরের কৃষক ফাইজুল্লাহ বলেন, “মানুষ কয় ধান ঘরে তুললে খুশিতে মন ভরে, আর আমার ঘরে এখন কান্নার সুর। মাড়াই তো শেষ করলাম, কিন্তু ধান তো শুকাইতে পারি না। রাইতদিন বৃষ্টি, ধানগুলা সব ভাইস্যা গেল। ঘরের চিপায়-চাপায় ধান স্তূপ কইরা রাখছি, কিন্তু পচন ধইরা সব ধানের রং কালা হয়া গেতাছে। ধানগুলা শুকানোর জন্য কি এক টুকরা রোদও কপালে নাই?”
উৎপাদন খরচ ও বাজারের নির্মম লোকসান
কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন খাতে যেখানে ৮-১০ হাজার টাকা খরচ হতো, এবার তেলের দাম বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতার কারণে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২০-২৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ, একর প্রতি বাড়তি খরচ বেড়েছিল প্রায় ১৫ হাজার টাকা। প্রতি মণে চাষাবাদ (বীজ, সার, সেচ ও জমি চাষ) বাবদ উৎপাদন খরচ ১,০০০ টাকা। এর সাথে জলাবদ্ধতার কারণে ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন খাতে বাড়তি ৩৫৪ টাকা যোগ হয়ে প্রতি মণে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ১,৩৫৪ টাকা। বিপরীতে বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়। সেই হিসেবে প্রতি মণে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৭৫৪ টাকা।
রং নষ্ট হওয়া ও আধা পচা ধানের এই সুযোগে ব্যাপারী ও আড়তদারেরা নিরুপায় কৃষকদের কাছ থেকে মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা মণ দরে ধান কিনছেন। তবে ধানের মানভেদে দামের এই পার্থক্য সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০ টাকা পর্যন্ত উঠছে।
স্তব্ধ চামড়া নৌবন্দর ও আড়তদারদের শঙ্কা
সরেজমিনে করিমগঞ্জের নাগচিন্নি নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী চামড়া নৌবন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। চিরচেনা গমগমে আড়তঘরগুলোর বেশির ভাগই এখন ফাঁকা পড়ে রয়েছে। আনার মিয়া নামের একজন আড়তদার আক্ষেপ করে বলেন, “গত বছর এই সময়ে দৈনিক কয়েক হাজার মণ ধান কিনতে পারতাম। এবার সারা দিনে ৫০০ মণ ধানও মেলা ভার। হাওরের ধান না বাঁচলে আমাদের বন্দর বাঁচব কেমনে? আগে এই সময়ে রাইত-দিন নৌকা ভিড়ত, আড়তে তিল ধারণের জায়গা থাকত না। এবার মহাজনরা ঢাকা-চট্টগ্রাম থেইকা ফোন দিয়া জিগায় ‘ধানের কী খবর?’ আমরা কই দিমু কী? যে ধান আইতাছে, হেইডা গুদামে তুললে দুই দিনেই চারা গজায়। কৃষকের কপাল তো পুড়ছেই, আমাদেরও কোটি কোটি টাকার ব্যবসা এবার নদী পারের বালুর চরে চইলা গেল।”
পল্টু কবির নামের আরেকজন আড়তদার বলেন, “এবার হাওরাঞ্চল থেকে যেসব ধান আসছে, বেশির ভাগই রং নষ্ট, আধা পচা। মানুষ মনে করতাছে কম দামে ধান পাইয়া আড়তদাররা বুঝি লাভ করতাছে। আসলে আমরা নিজেরাও আতঙ্কে আছি। ৪০০-৪৫০ টাকা মণে যে আধা পচা ধান কিনতেছি, হেইডা চাতালে নিয়া রোদ না খাওয়াইলে দুই দিনেই গন্ধ হয়া যাইব। এদিকে টানা বৃষ্টিতে চাতাল মালিকরা ধান শুকানোর সাহস পাইতাছে না। কুয়াশার মতো মেঘ লাইগাই আছে। টাকা খাটায়া এই পচা ধান ধইরা রাইখা আমরাও এখন বড় ঝুঁকিতে পইড়া গেলাম।”
নদীর তীরে নোঙর করা সামান্য কিছু ধানবোঝাই নৌকা থেকে শ্রমিকদের ধানের বস্তা মাথায় করে আড়তে তুলতে দেখা যায়, যা পরে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, হাওরের এই ফসলহানির ধাক্কা শুধু কৃষকের ওপরই নয়, এই ব্যবসাকেন্দ্র এবং এর সঙ্গে জড়িত শত শত শ্রমিকের জীবিকার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
কৃষকদের বুকফাটা আর্তনাদ ও এনজিওর কিস্তি
করিমগঞ্জ উপজেলার খয়রত গ্রামের এক কৃষক চার কানি জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছিলেন। তার দুই কানি জমিই তলিয়ে গেছে। তার স্ত্রী হেনা আক্তার ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ” এনজিও থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি। প্রতি মাসে ১১ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। কিস্তি আদায়কারীরা প্রতিমাসেই আইসা কয় যেদিন তারিখ হেদিনের মধ্যেই টাকা দেওনই লাগব। পোলাপানরে খাওনই দিতাম পারতাছি না, কিস্তি দিমু কেমনে? হেরার তো এইটা বুঝার দরকার আছিন। হেরা পরিশোধের আল্টিমেটাম দেয় কেমনে?”
অষ্টগ্রাম উপজেলার পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক আনোয়ার হোসেন (৪৮) বলেন, “সঞ্চিত টাকা আর ধারদেনা করে সাড়ে ৩ একর জমি চাষ করছি। ধান বিক্রি করে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ করবো। বৃষ্টি আর পানিতে সব তলিয়ে গেছে। এখন পথে বসতে হবে।”
আসন্ন কোরবানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ি গ্রামের কৃষক শহীদ মিয়া। ১০ একর জমিতে আবাদ করা এই কৃষকের চোখে শুধুই অন্ধকার। তিনি বলেন, “সব গেছেগা। খাইতামই পারতাছিনা, কোরবানি দেম কেমনে?”
সরকারি চাল সংগ্রহ ও সাধারণ কৃষকের বঞ্চনা
একদিকে বাজারে কম দামে বাধ্য হয়ে ধান বিক্রি করছেন চাষিরা, অন্যদিকে সরকারি সংগ্রহ অভিযানে ‘ঝকঝকে’ ধানের কড়া নিয়মের কারণে সাধারণ কৃষকদের সরকারি গুদামে ধান তোলার সব পথও বন্ধ হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকার প্রতি মৌসুমে ধান কিনলেও কৃষক সরাসরি গুদামে দিতে পারেন না। ফড়িয়ারা সস্তায় ধান কিনে গুদামে দেন। এতে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হন।
জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ মে থেকে সরকারিভাবে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, যা চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। চলতি মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে (১,৪৪০ টাকা মণ) ১৮ হাজার ৩৩০ টন ধান এবং ৪৯ টাকা কেজি দরে ২৩ হাজার ৩২৪ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সরকারের এই ন্যায্যমূল্যের সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ কৃষকেরা। কিশোরগঞ্জ জেলার সহকারী খাদ্যনিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাবে। তবে কৃষকদের কাছ থেকে কোনো রকম রং নষ্ট বা ভেজা ধান নেওয়া হচ্ছে না। কেবল ঝকঝকে পরিষ্কার ও শুকনা ধানই সংগ্রহ করা হচ্ছে।”
সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি ও সরকারি আশ্বাস
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত মাত্র ৯ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে কিশোরগঞ্জ। সোমবার পর্যন্ত চার ধাপে জেলায় বোরো ধানের ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৯৬৩ হেক্টর। জেলায় সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে ৮৪ হাজার ৮৭০ মেট্রিক টন ধানের (চালে যার পরিমাণ ৫৬ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন)।
উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, “মাঠপর্যায়ের সেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে, যা যাচাই-বাছাই শেষে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।”
কৃষকদের এই চরম দুর্দশার বিষয়ে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, ঈদের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত সাহায্য কার্যক্রমটি শুরু করে দেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন