ভালো বেতনে কোম্পানির চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার যুবক মো. জাহাঙ্গীর হোসাইনকে (২৫)। কিন্তু সেখানে গিয়ে ভাগ্যবদল তো দূরের কথা, এজেন্সির প্রতারণার শিকার হয়ে বাধ্য হন দেশটির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে। অবশেষে দুই মাসের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শেষে ফ্রন্টলাইনে পাঠানোর মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় প্রাণ হারাতে হলো তাকে।
গত ১৮ মে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে এই ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এতে জাহাঙ্গীরসহ মোট তিনজন বাংলাদেশি নিহত এবং একজন আহত হয়েছেন। নিহত অপর দুজন হলেন মাদারীপুরের মো. সুরুজ কাজী ও কুমিল্লার মো. ইউসুফ খান।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাতে রাশিয়ায় জাহাঙ্গীরের সাথে একই সেনা ক্যাম্পে কর্মরত মৃদুল নামের অপর এক বাংলাদেশি যুবক ফেসবুক ভিডিওর মাধ্যমে এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। মৃদুলের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। ঘটনার তিন দিন পর সত্যতা নিশ্চিত হয়ে তিনি জাহাঙ্গীরের পরিবারকে বিষয়টি জানান।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত জাহাঙ্গীর করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল বাগপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। দুই বছর আগে বাবাকে হারানো জাহাঙ্গীর ছিলেন তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। ঘরে রয়েছে তাঁর স্ত্রী মাশুকা এবং দুই বছরের একটি কন্যাসন্তান।
পরিবারের হাল ধরতে মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে একটি এজেন্সির মাধ্যমে ও কোম্পানির চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় পাড়ি জমান জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীরের ফুফাতো ভাই মো. রমজান জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথমে তাকে একটি পিগ ফার্মে (শূকরের খামার) মাসখানেক কাজ দেওয়া হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবার না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন জাহাঙ্গীর। এরপর সুস্থ হলে রেস্টুরেন্টে চাকরি দেওয়ার নাম করে ওই এজেন্সি জাহাঙ্গীরসহ মোট সাতজন বাংলাদেশিকে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। সেখানে জোরপূর্বক তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
রমজান আরও জানান, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি কেবল জাহাঙ্গীরের স্ত্রী জানতেন। লোকলজ্জা ও ভয়ের কারণে অন্য কাউকে তা জানানো হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে পরিবারের সাথে শেষবার কথা বলার সময় জাহাঙ্গীর জানিয়েছিলেন, তিনি কিছুদিনের জন্য নেটওয়ার্কের বাইরে থাকবেন।
ফেসবুক ভিডিও বার্তায় জাহাঙ্গীরের সহকর্মী মৃদুল এই নির্মম পরিণতির জন্য সরাসরি একটি এজেন্সিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “এমন দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী হলো ‘আরাফা আল মনোয়ার’ নামের একটি এজেন্সি (যাদের আরএম নম্বর ১.৪২)। তাদের প্রতারণার জন্যই আজ আমি আমার তিনজন বন্ধুকে হারালাম।”
এ বিষয়ে জয়কা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবির গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “ঘটনাটি শুনে খুবই মর্মাহত হয়েছি। জাহাঙ্গীর হোসাইনের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।”
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরানুল কবির জানান, “অফিসিয়ালি এখনও কোনো চিঠি না পেলেও সংবাদ পেয়ে আমরা নিহত জাহাঙ্গীর হোসাইনের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা রাশিয়ায় জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
রাশিয়ায় ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে এভাবে কতজন বাংলাদেশিকে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে এখন স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এই মানবপাচারকারী চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে।
করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে মুসলিমা বলেন, স্থানীয় চেয়ারম্যান বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। আমি তৎক্ষনাৎ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছি। ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষ যেভাবে নির্দেশনা দিবেন আমরা সেভাবেই ব্যবস্থা নেব।
মন্তব্য করুন